- বহির্বিভাগে টিকেট বানিজ্য
- পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হাসপাতাল জুড়ে দালের উৎপাত
- শয্যাসংকটে মেঝেতে চিকিৎসা রোগীদের
- রাত ১২টার পর অ্যাম্বুলেন্স চক্রের কাছে অসহায় রোগী ও স্বজনরা
জাহিদ পাটোয়ারী:
চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তির শেষ নেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে। বহির্বিভাগে টিকিট পেতে হয়রানি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে দালালের তৎপরতা, অ্যাম্বুলেন্স চালকদের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে অসহায় রোগী ও স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ।
এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র শয্যাসংকট। ৫০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকছেন ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগী। ফলে অনেককে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও করিডরে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাজারো মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন এ হাসপাতালে আসেন। তাদের বড় একটি অংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। কিন্তু হাসপাতালে প্রবেশের পর থেকেই অনেককে পড়তে হচ্ছে নানা অনিয়ম ও হয়রানির মুখে। বহির্বিভাগে টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভর্তি—প্রতিটি ধাপেই দালালদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ ভালো চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে, শয্যা ও জনবলসংকটে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাও পড়েছে চাপে। প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।

শয্যার কয়েক গুণ রোগী, মেঝেতেও চিকিৎসা :
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে কুমেক হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় ২০০৮ সালে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে শয্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জনবল বাড়েনি। বর্তমানে কুমিল্লার ১৭টি উপজেলা ছাড়াও আশপাশের পাঁচ জেলার রোগীরা এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল।
৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা, করিডর এমনকি সিঁড়ির পাশেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন।
সরেজমিন হাসপাতালের মেডিসিন, শিশু ও সার্জারি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। মেডিসিন ওয়ার্ডে নারী-পুরুষের জন্য ৯৮টি শয্যা থাকলেও ভর্তি রয়েছেন ৪৬৬ জন। শিশু ওয়ার্ডে ৫৪টি শয্যার বিপরীতে রোগী ২২৮ জন। সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৮২ জন।
মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আবু রায়হান রাশেদ নতুন কুমিল্লাকে বলেন, তাদের বিভাগে নারী ও পুরুষের জন্য ৪৯টি করে মোট ৯৮টি শয্যা রয়েছে। এর বিপরীতে চার থেকে সাড়ে চার গুণ রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ৪৬৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়ার্ডে শয্যা ও জনবল বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ নতুন কুমিল্লাকে বলেন, এ হাসপাতালে চিকিৎসার মান ভালো হওয়ায় কুমিল্লার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা আসেন। শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ৫৪টি শয্যা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ভর্তি ২২৮ জন। রোগীর তুলনায় জনবলও খুব কম। তারপরও সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

বহির্বিভাগে টিকেটের অপেক্ষায় শত শত রোগী / নতুন কুমিল্লা
টিকিট ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দালালের তৎপরতা :
হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকিট সংগ্রহকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রোগীদের। অভিযোগ রয়েছে, চক্রের সদস্যরা ৫০ থেকে ১০০ টাকায় ঘুরে ঘুরে টিকিট বিক্রি করেন। নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ানো রোগীদের অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও টিকিট পান না। আবার দালালদের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে অনেকে আগে চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ পান।
চাঁদপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা খোরশেদা বেগম বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু দালালদের উৎপাতের কারণে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত টিকিট পাননি। দালালরা ৫০ থেকে ১০০ টাকায় ঘুরে ঘুরে টিকিট বিক্রি করছেন। অনেকেই তাদের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে চিকিৎসক দেখাচ্ছেন। নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়িয়েও তিনি টিকিট না পাওয়ায় কখন চিকিৎসক দেখাতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে মাকে চর্মরোগের চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতালে আসার পরই দালালের খপ্পরে পড়েন। ভালো চিকিৎসার কথা বলে তাকে ভুল বুঝিয়ে শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে পরিচিত একজনের দেখা পেয়ে তিনি আবার হাসপাতালে ফিরে আসেন।
ছাইদুল হক নামে আরেক রোগীর স্বজন জানান, মেয়ের আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে গেলে এক নারী তাকে বলেন, হাসপাতালে ভালো রিপোর্ট পাওয়া যায় না। পরে ওই নারীর পরামর্শে হাসপাতালের পাশের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করান তিনি।
জরুরি বিভাগেও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের দৌরাত্ম্য :
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের নিয়েও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের টানাটানির অভিযোগ রয়েছে। ভালো চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা—এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

আনসার সদস্যদের বাঁধা উপেক্ষা করে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে অ্যাম্বুলেন্স চক্র/ নতুন কুমিল্লা
চৌদ্দগ্রামের চন্দ্রপুরের বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, রাত ১২টার দিকে তার মায়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা শুরু হলে তাকে কুমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগে নেওয়ার আগেই ৪-৫ জন অ্যাম্বুলেন্সচালক এসে তার মাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেন। আনসার সদস্যদের সামনেই তারা একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বেসরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পাওয়ার কথা বলে সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্সচালকদের হাত থেকে রক্ষা পান তিনি।
হাসপাতালের আঙিনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনসার সদস্য মোতায়েন থাকলেও এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
এসব বিষয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. শাহজাহান নতুন কুমিল্লাকে বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ২৫০ শয্যার জনবল দিয়েই ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে সংকটের মধ্যেই সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা শয্যাসংকট। হাসপাতালটি ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করার বিষয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দালালের উৎপাতের বিষয়ে পরিচালক বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে কয়েক দিন পরপর অভিযান চালানো হয়। এরই মধ্যে কয়েকজন টিকিট কালোবাজারিকে আটক করে নকল টিকিট উদ্ধার করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স চক্রের বিরুদ্ধেও সতর্ক রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।




